ঢাকা | বঙ্গাব্দ
.

আওয়ামী লীগ নিজে হেরেছে, বাংলাদেশকে কি জেতাতে পেরেছে?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 23, 2026 ইং
আওয়ামী লীগ নিজে হেরেছে, বাংলাদেশকে কি জেতাতে পেরেছে? ছবির ক্যাপশন:
#

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের ব্যবধানে পাকিস্তানের শাসকেরা বাঙালিদের প্রতি অবমাননাকর আচরণ আরম্ভ করে। পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। উভয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত শেখ মুজিবসহ সবাই এই ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন। এখান থেকেই পূর্ব ও পশ্চিমের মানুষের মধ্যে বিভক্তির বীজ রোপণ হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি। রাষ্ট্রভাষা যদি করতেই হয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ছিল; কিন্তু সংখ্যালঘু মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ইহা বাঙালিদের ব্যথিত করে।

অন্যদিকে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই বাঙালিদের বঞ্চিত করা দেখে শেখ মুজিবুর রহমানসহ যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিলেন, তারা সবাই ক্ষুব্ধ হন। দেখা গেল পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার সর্বত্র বৈষম্য সৃষ্টি এবং বাঙালিদের নিচুজাত হিসেবে প্রকাশ্য/অপ্রকাশ্য অবমাননা করা—পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের মারাত্মকভাবে ব্যথিত করে।

এই অবস্থায় বাঙালিদের সমমর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ মুজিবসহ সিনিয়রের নেতৃবৃন্দ বারবার সভা করেন এবং ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেন প্যালেসে এক সভায় আওয়ামী লীগ দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে দলটি গঠন করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার একজন মূল কারিগর হলেও প্রতিষ্ঠাকালীন কোনো নির্বাহী পদ নেননি।

ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাঁর তত্ত্বাবধানে ৪ঠা জানুয়ারি নাইমুদ্দিন আহম্মেদ ও খালিদ নেওয়াজের নেতৃত্বে ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় যুগপৎ আন্দোলনের জন্য ১৯৬৯ সালে শ্রমিক লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঐ সময় শেখ মুজিব ও অন্য নেতারা লক্ষ্য করেন, পাকিস্তান গণতন্ত্র, সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও জনপ্রতিনিধিদের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে একের পর এক সামরিক শাসন জারি ও বিশেষ গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আরও লক্ষ্য করা যায়, অবিচার ও বৈষম্যের পাশাপাশি পশ্চিমের বিশেষ সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা পাকিস্তান পরিচালিত হচ্ছিল। তাদের স্বার্থ ও সুবিধা ব্যাহত রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানেও কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়, যাতে জনরোষ মোকাবিলা করে দুঃশাসন অব্যাহত রাখা যায়। এদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব থাকলেও তরুণ নেতা শেখ মুজিব বারবার কারাবরণ করেও দমে যাননি।

অন্যদিকে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধের কারণে ১৯৫৭ সালের ১৮ই জুলাই মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শিক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেন।

ঐ অবস্থায় ছাত্রসংগঠন ও আওয়ামী লীগের সকল নেতা-কর্মী শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারা দেশে শক্তিশালী অবস্থান নেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া ও আওয়ামী লীগ ত্যাগ করলেও শেখ মুজিবকে পছন্দ করতেন। সেই কারণে সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকেও তাঁর সফলতা কামনা করতেন। কারণ তাঁরা মনে করতেন শেখ মুজিব তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, কঠোর পরিশ্রমী ও ত্যাগী; তাঁর পক্ষেই বাঙালি জাতির অধিকার আদায় করা সম্ভব। তাঁর গুণাবলীর কারণে পশ্চিম পাকিস্তানেরও অনেক নেতা শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন।

বাঙালিরা যাতে সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারে, সেই জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী—যেমন রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলাম, আনিসুর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ৬ দফা দাবি প্রণয়নে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন। এই ৬ দফা বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করান। পরবর্তীতে এই ৬ দফার পক্ষে এই বলে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়—"আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা।" এই উপলব্ধি থেকে গোটা জাতি ৬ দফার পক্ষে অবস্থান নেয়। মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৩৬.৩০% ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসকারী এবং ৬৩.৭৭% পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী। অথচ পাকিস্তানের আয়ের ৭১.১৬% পশ্চিম পাকিস্তানে এবং ২৮.৮৪% পূর্ব পাকিস্তানে বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু সিংহভাগ আয় আসত পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চামড়া, চা রপ্তানি ইত্যাদি থেকে।

বঙ্গবন্ধুর কারাবরণ ও আত্মত্যাগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতি ও এদেশের জন্য কী পরিমাণ নির্যাতন ও কারাবরণ সহ্য করেছেন, তা লিখতে গেলে বারবার চোখে পানি আসে। নিচে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো:

১৯৩৮ সাল: প্রথম ছাত্রনেতা হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কারণে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হয়ে ৭ দিন জেলে ছিলেন।

কলকাতা পর্ব: কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র থাকাকালীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

১১ই মার্চ ১৯৪৮: রাষ্ট্রভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে ১৫ই মার্চ মুক্তি লাভ করেন।

১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৮: মানুষের মারাত্মক খাদ্যভাবের সময় বুভুক্ষু মানুষের পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে ২১শে জানুয়ারি ১৯৪৯ তারিখে মুক্তি লাভ করেন।

১৯শে এপ্রিল ১৯৪৯: ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে ১৯শে জুলাই পর্যন্ত জেল খাটেন।

১৪ই অক্টোবর ১৯৪৯: ব্যাপক দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ পর্যন্ত ২ বছর ৫ মাস জেল খাটেন।

১৯৫৪ সাল: প্রাদেশিক মন্ত্রীসভার সদস্য হলেও ১৫ দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা বাতিল করে এবং ৩০শে মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে।

আইয়ুব খান আমল: আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে তাঁকে জেলে পাঠায় এবং ৭ই ডিসেম্বর ১৯৬০ পর্যন্ত জেলে রাখে।

৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬২: নিরাপত্তা আইনে আটক করে ১৮ই জুন ১৯৬২ পর্যন্ত জেলে রাখা হয়।

১৯৬৪-১৯৬৫ সাল: রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তৃতার অভিযোগ তুলে তাঁকে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে মোট ৬৬ posts (৬৬৫ দিন) জেলে রাখা হয়।

১৯৬৬-১৯৬৯ সাল: বাঙালিদের প্রতি অবিচার রোধে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসন চাওয়ায় ১৯৬৬ সালের ৮ই মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে আটকে রাখা হয়। কিন্তু জনগণের ব্যাপক আন্দোলনের কারণে তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৭১ সাল: সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপর পাকিস্তানি আর্মিরা আনুমানিক রাত ২টার সময় তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৮ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

স্বাধীনতা ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য দূর ও ন্যায্য সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই দল আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গবন্ধুর জীবনদশায় জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়াসহ যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ৫২টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশ। কিন্তু উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করার সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা জাতির পিতা হলেও বঙ্গবন্ধু নিজের সাধারণ ৩২ নং ধানমণ্ডির বাড়িতে একজন সাধারণ মানুষের মতো থাকতেন। তিনি ভাবতেন—"পাকিস্তানিরা আমাকে মারেনি, বাঙালিরা কি আমাকে মারতে পারবে?"

১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসন লাভ করে। শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালিদের ওপর হত্যা-নিপীড়ন আরম্ভ করে।

তখন ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষের অধিক মানুষের জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় বলেন, "জনগণের শাসনব্যবস্থা কায়েমের জন্য যখনই ক্ষমতায় যেতে চেয়েছি, তখনই ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি।" বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, "২৩ বছরের পাকিস্তানের ইতিহাস রক্ত দিয়ে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। আমরা জীবন দিয়ে এটার অধিকার পাওয়ার চেষ্টা করেছি। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমি যদি আর হুকুম দিতে নাও পারি, আমাদের দেশ মুক্ত হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। জয় বাংলা।"

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও স্বস্ব অবস্থান থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন। তারপরও পাকিস্তানের জান্তা শাসক ইয়াহিয়ার অনুরোধে আলোচনায় বসেন; কিন্তু সকল আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যা ওয়্যারলেস/টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে বিডিআর হেডকোয়ার্টারসহ অনেক আওয়ামী লীগ নেতার নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এটি পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।

তাঁর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে যান। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়।

এই ধারাবাহিক বর্ণনার পর যাদের ন্যূনতম মনুষ্যত্ব আছে, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আছে—তারা কি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কাউকে স্বাধীনতার ঘোষক বা জাতির পিতা বলতে পারে? পরকাল ও ইতিহাস কি তাদেরকে ক্ষমা করবে? আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আমাদের ইতিহাসে মিথ্যার স্থান যেন না হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট আজকে যারা মুক্তিযুদ্ধকে ব্যঙ্গ করে, তাদের পূর্বসূরিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা ও পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। যে পাকিস্তান আমাদেরকে শাসন-শোষণ, মা-বোনদের ধর্ষণ এবং ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে, এখন তারা তাদের পক্ষে বুক ফুলিয়ে কথা বলে। আর যে ভারত আমাদের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় ও নয় মাস খাবারের ব্যবস্থা করেছে, স্বাধীনতার পর থেকেই তাদের সাথে আমাদের সংঘাত লাগানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। কারণ তারা মনে করে ভারত যদি সাহায্য না করত, তাহলে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারত না। তাদের পূর্বপুরুষেরা পাকিস্তানের মদদ নিয়ে যে অত্যাচার স্বজাতির উপর করেছিল, তা অব্যাহত রেখে রাষ্ট্রীয় জীবন যাপন করতে পারত না। তাদের উত্তরসূরিরা ভারতের সাথে সংঘাত সৃষ্টির জন্য উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে। তারা বলে আওয়ামী লীগ ভারতকে সব দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে কিছুই দেবে না—তা তো নয়।

বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসা ছিটমহল জটিলতার মীমাংসা শেখ হাসিনা করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭,০০০ একর জমি আর ভারত পেয়েছে ৭০০ একর। ইহা কি ভারতকে দেওয়া হলো, নাকি ভারতের কাছ থেকে নেওয়া হলো? পাকিস্তান সৃষ্টির আমল থেকে সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ ছিল, তা শেখ হাসিনার সরকার ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মীমাংসা করে। যার মধ্যে ১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা বাংলাদেশ পায় আর ভারত পায় ৬,১০৫ বর্গকিলোমিটার। এতেই কি প্রমাণিত হয় না যে, আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের স্বার্থে কখনও কোনো দেশের কাছে আপস করেনি?

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বলেছিলেন, "আমাদের পররাষ্ট্রনীতি—সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়।" সেই নীতি অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফেরার পথে দিল্লির এয়ারপোর্টে নেমে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে জিজ্ঞেস করেন, "ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে কবে ফেরত যাবে?" উত্তরে তিনি বলেন, "আপনি যখন চাইবেন তখনই যাবে"—এবং অল্প সময়ের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়। সকল বিষয়ে ভারতের সাথে সমমর্যাদার নীতি আওয়ামী লীগ সরকার অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশের স্বার্থে একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি এবং কম দামে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বিনষ্ট করার জন্য এবং জনমনে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন মিথ্যা অপপ্রচার করা হয়। তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ধ্বংস চায়।

আমরা যদি European Union (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) হওয়ার পূর্বের অবস্থা ও পরের অবস্থা পর্যালোচনা করি, তবে দেখব ইউরোপে পণ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, সেবা ও পণ্যমূল্যসহ সকল খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সেই জন্য দার্শনিকেরা বলেন—"যারা বোকা তারা প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে, আর বুদ্ধিমানেরা দূরের বন্ধুর চেয়ে কাছের শত্রুকেও (বা প্রতিবেশীকেও) বন্ধু বানায়।" এতে উভয়েরই উন্নতি হয়।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন, তখন আমরা ছিলাম একটি দরিদ্র দেশ। মাথাপিছু আয় ছিল ৩৭২ ডলার, বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল ১০ ভাগ, খাদ্যে ঘাটতি ছিল প্রায় ৫০ লক্ষ টন, শিক্ষার হার ছিল ৩৮%। আর এখন মাথাপিছু আয় ২,৮২৪ ডলার, বিদ্যুৎ সংযোগ শতভাগ, খাদ্যে কোনো ঘাটতি নেই, শিক্ষার হার ৭৭%। দারিদ্র্যের হার ৫৩% থেকে কমিয়ে ১৮.৭০%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। দরিদ্রের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত দেশের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাঁর কন্যার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান করে নিয়ে উন্নত দেশের পথে যাত্রায় ছিল। কিন্তু জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ কোটা আন্দোলনের নামে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। নিজেরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নাম দিয়ে নিজেদের লোককে হত্যা করে আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপায়। ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের ইচ্ছামাফিক আইন বানিয়ে পুলিশ ও বিচারবিভাগকে নিজেদের মতো ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দিচ্ছে। অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশের আইজিপি, প্রধান বিচারপতি, সচিব, সাংবাদিকসহ অনেককে জেলে পুরে নির্যাতন করা হচ্ছে। ভয়-ভীতির মাধ্যমে ইচ্ছামতো সাজা দেওয়া হচ্ছে। মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ দিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এ দেশের আশি ভাগ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আওয়ামী লীগের পুনঃপ্রত্যাবর্তনের জন্য। ইনশাআল্লাহ, আওয়ামী লীগ আবার নেতৃত্ব দিয়ে উন্নত ও গর্বিত বাংলাদেশ গড়বে।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Ovoy Sarker

কমেন্ট বক্স
করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর